আমার বন্ধু তাসফিয়া একদিন হুট করে জানালো, ওর ফুলফান্ড স্কলারশিপ হয়ে গেছে। শীঘ্রই ওর গন্তব্য আটলান্টিকের ওপারের দেশ আমেরিকায়। তখন মিরপুরের এক শান্ত রাস্তায় হাঁটছিলাম আমরা। শেষ বিকালের ম্যাড়ম্যাড়ে আলোয় বিষণ্ন লাগছিলো পথঘাট। এর কিছুক্ষণ আগেই তাসফিয়া আমাকে ভরপেট ভাত খাইয়েছে। সেদিন ওর স্কলারশীপ-প্রাপ্তির আনন্দ আমার যেমন হয়েছিলো, তেমন ভয়ও পেয়েছিলাম। শীতল একটা অনুভূতি অসাড় করে দিয়েছিলো আমাকে। মনে হচ্ছিলো, মৃতপ্রায় এই নগরী ঢাকায় আমার সবচেয়ে আপনজনদের একজন কমে গেলো।
পড়াশোনার নামে পরিবারের আশ্রয় ছেড়ে আমাকে ঢাকায় পাঠানো হয় ২০০০ সালে। ততোদিনে বাবার সরকারী চাকরির বদলৌতে একের পর এক শহর বদলানো, স্কুল পাল্টানোর অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। সদরঘাটে শুরু হয় ঢাকার জীবন। সেদিন থেকে জাহাঙ্গীরনগরে আসা পর্যন্ত আমার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়নি। একের পর এক প্রতিষ্ঠান বদলাতে হয়েছে। নতুন মানুষজন এসেছে জীবনে। তাদের চলে যাওয়া দেখেছি। খুব কাছের মনে করা সহবন্ধুরা বুঝিয়ে দিয়ে গেছে, তারা আমাকে বন্ধু মনে করতো না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ডিপার্টমেন্টে পাওয়া বন্ধু এশার মাধ্যমে পরিচয় হলো বেশকিছু খাপছাড়া লোকজনের সঙ্গে। ক্যাম্পাস থেকে মিরপুরের বাসের যাত্রী ছিলো সবাই। তাসফিয়া ছিলো সেই ছোট্ট গ্রুপের একজন। তাসফিয়াকে আমরা নিজেদের আবিস্কৃত ডায়নোসরের নতুন প্রজাতি, ইউসোরাস বলে ডাকতাম। আমি অবাক হয়েছিলাম, আমার উস্কুখুস্ক চুল, ছন্নছাড়া পোশাক-আশাক আর গালভর্তি দাঁড়ি তাদের কাছে অস্বস্তির কারণ হচ্ছে না। বয়সের তফাৎ, রুচির ভিন্নতা যেনো পাত্তা পায়নি। সহাপাঠী থেকে ওরা আমার কাছে আরেকটু বেশি কিছু হতে থাকলো।
শৈশব থেকে শুরু করে কৈশোরের বড় একটা সময় আমি মাদরাসায় পড়েছি। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে বড়সর পার্থক্য ছিলো জানাশোনায়। সেজন্য সামাজিকভাবে প্রচুর অপদস্থ হওয়ার অভিজ্ঞতাও আমার হয়েছে। মাদরাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়-নানা শিক্ষাপদ্ধতির ভেতর দিয়ে যাওয়ার কারণে জ্ঞানের শূন্যতা সহজে নজরে পড়তো। সত্যিকারের জ্ঞানী মানুষ সহজে পাওয়া যায় না, আজীবন এই বিশ্বাস নিয়েই চলেছি।
কিন্তু, জানা ও শেখার প্রতি ভয়াবহ আগ্রহের জন্য আমি তাসফিয়াকে রীতিমতো সমীহ করি। সবকিছুকে প্রশ্ন করা, অযৌক্তিক অনুষঙ্গের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা, পড়াশোনায় বুঁদ হয়ে থাকা-এসব গুণের কারণে তাসফিয়া আমার শ্রদ্ধা আদায় করে নিয়েছিলো। ওর প্রতি আমার সেই সম্মানটুকু প্রতিদিনই বেড়েছে। আমাদের মধ্যে অনেককিছুতেই বিশাল মতপার্থক্য রয়েছে। রয়েছে বিশ্বাসের নানারকম ভিন্নতা। আর, জানাশোনার দিক থেকে ওর তুলনায় আমি রীতিমতো নাদান। তবুও, তাসফিয়াকে আমি সবিনয় শ্রদ্ধা করি।
আমি জানিনা, ঢাকার শেওড়াপাড়া থেকে আমেরিকার নর্থ ইলিনয় ঠিক কতো হাজার কিলোমিটার দূরে। কিন্তু এটা জানি, তাসফিয়াকে আমার খুব মনে পড়ে। আগামীতে হয়তো আর কখনো মিরপুরের রাস্তায় একসঙ্গে হাঁটার জন্য ওকে খুঁজে পাবো না। পিএইচডি শেষে ড. তাসফিয়ার প্রতিটি মুহুর্ত আগের চাইতে আরও মূল্যবান হয়ে উঠবে। তখন ইচ্ছা থাকলেও ওর সময় থাকবে না। বন্ধু তাসফিয়াকে মিস করার ধরণও হয়তো বদলাবে। কিন্তু, আমি ওকে মনে রাখবো।
ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়। বয়সের ভার একটু করে বাড়তে থাকে। পৃথিবী নিয়ে আমার বুঝাপড়াও প্রতিদিন পাল্টাচ্ছে। সারা দুনিয়ার প্রতি রাগ, মানুষের প্রতি অভিমান ধীরে ধীরে কমে আসছে। নির্বাণ লাভ করা সত্যিকার অর্থে সম্ভব কিনা, জানি না। তবে, নির্মোহ হতে চাইছি। খুব সাধারণ কেউ। জীবনের এই পর্যায়ে মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ হতে শিখছি। প্রিয়জনদের কাছে জমতে থাকা ঋণ আমাকে আরও নতজানু করছে। সেকারণে তাসফিয়ার কাছে আমি আরও কৃতজ্ঞ হই। একই টাইমলাইনে আমরা কাছাকাছি এসেছিলাম, এইটুকু মন্দ না।
প্রিয় ইউসোরাস,
ভালো থাকিস, আমাদের সব প্রার্থনা আর শুভ কামনার ছাঁয়ায়!